
ডেস্ক নিউজ
সম্প্রতি কিছুদিন আগেই শুরু হওয়া অনলাইন প্লাটফর্ম থেকে একটি ক্ষুদ্র ছাত্র জনগোষ্ঠীর আন্দোলন অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে গোটা ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে যা, দীর্ঘ এক যুগের মোদী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতিকেও যেন ছাড়িয়ে গেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরেও এই আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ের আন্দোলন বন্ধ না করায় বিশ্লেষকদের কাছে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি মোদীর ক্ষমতার মসনদকে না কাঁপিয়ে ওরা থামবে না?
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস, দুর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা এসব অল্প কিছু দাবি নিয়ে তৈরি হওয়া আন্দোলন অতি অল্প সময়ের মধ্যে গোটা ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
মোদির অপশাসন, একনায়ক তান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কাঠামো ভাঙতে দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিরোধীরা ব্যর্থ হওয়া কিংবা প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো যখন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ব্যর্থ, তখন ছাত্রদের এই অনলাইন প্লাটফর্মটি যেন গোটা ভারতের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে নেমে এসেছে। তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলন বিশ্বগুরু মনে করা মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
কিন্তু অরাজনৈতিক ছাত্রদের সংগঠন সিজেপি তাতেও সন্তুষ্ট নয়, তাদের আরো দুটি দাবি পূরণ না করা হলে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আর এই বিক্ষোভ সারা দেশে এত দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে যে, দীর্ঘ এক যুগের মোদীর শাসনামলেও মোদি সরকারের এমন টনক নড়াতে পারেনি কোন শক্তি। অথচ শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের পরেও ছাত্রদের হাতে তৈরি হওয়া এই আন্দোলন থেকে বলা হয়েছে, বাকি দুটো দাবি সরকার পূরণ না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন থামবে না। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরেও আন্দোলন না থামানোর ঘোষণা কি অন্য কিছুর বার্তা দিচ্ছে? ছাত্রদের পক্ষ থেকে করা বাকি দুটি দাবি পূরণ হলেও এ আন্দোলন এখানেই থেমে যাবে নাকি এর মাধ্যমে দীর্ঘ এক যুগের শাসন ক্ষমতায় থাকায় ১৪০ কোটি মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হওয়া মোদি সরকারের ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেবে সেটি এখন বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষমতা যত দীর্ঘ হয়, তার আত্মবিশ্বাসও তত দীর্ঘ হয়।
কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, কখনো কখনো সেই দীর্ঘ আত্মবিশ্বাসই ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আমলাতন্ত্র, এমনকি জনমত তৈরির বিভিন্ন মাধ্যম—সবকিছুর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর অনেক সরকারই মনে করে, রাস্তায় মানুষের কণ্ঠ আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। অথচ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি হলো—নিয়ন্ত্রিত নীরবতার ভেতরেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদের জন্ম হয়।
দিল্লিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-জনতার চলমান বিক্ষোভ সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
আন্দোলন দমাতে লাঠিচার্জ, জলকামান কিংবা কাঁদানে গ্যাসের মতো কঠোর পন্থা যত বেশি আলোচনায় এসেছে, ততই প্রতিবাদের আগুন অন্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে—এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকের।
কোনো আন্দোলন কেবল একটি ঘটনার বিরুদ্ধে থাকে না; অনেক সময় তা বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে যে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে না, তখন একটি দাবির আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নে রূপ নেয়। তখন আর প্রশ্ন থাকে না শুধু একটি সিদ্ধান্তের; প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও সেই প্রশ্ন উচ্চারিত হচ্ছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্রমেই অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে, যার ফলে সমালোচনার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে সরকার ও তাদের সমর্থকদের বক্তব্য, তারা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই উন্নয়ন ও প্রশাসন পরিচালনা করছে। এই দুই বিপরীত বয়ানের সংঘাতই আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো আন্দোলনের চাপে একজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন, তবুও আন্দোলন থেমে না থেকে আরও দাবি সামনে আনে, তাহলে সেটি নিছক প্রশাসনিক সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং জনআস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন বলেই অনেকে মনে করেন।
কারণ আন্দোলন যখন নেতৃত্বের চেয়ে বৃহত্তর জনমনে স্থান করে নেয়, তখন সেটিকে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে দেখা গেছে, প্রথমে মানুষ একটি দাবিতে রাজপথে নামে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দাবি রূপ নেয় বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। সে কারণেই আজ অনেকের প্রশ্ন—এই আন্দোলন কি কেবল কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক রূপ নেবে?
এর উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস লাঠি, জলকামান কিংবা কাঁদানে গ্যাস নয়; জনগণের আস্থা। সেই আস্থায় ফাটল ধরলে সবচেয়ে সুদৃঢ় ক্ষমতার কাঠামোও অপ্রতিরোধ্য থাকে না।
শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের পরিণতি যাই হোক না কেন, একটি শিক্ষা ইতিহাস বারবার দিয়েছে—ক্ষমতা মানুষের কণ্ঠকে দীর্ঘদিন স্তব্ধ রাখতে পারলেও চিরদিন নীরব রাখতে পারে না। আর যখন নীরবতা ভাঙে, তখন তার প্রতিধ্বনি শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।