
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাংগু মোটরস; মালিক নিপুর কান্তি দাস—কাজের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন, জবাবদিহির দাবি স্থানীয়দের”
সাদ্দাম হোসেন সাইফ | লামা, বান্দরবান।
বান্দরবানের লামা উপজেলার ইয়াংছা–বদুরঝিরি সড়কে গাইড ওয়াল ও আরসিসি আউটলেট ড্রেন নির্মাণকাজে ধীরগতি এবং নির্মাণের কয়েক দিনের মধ্যেই দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাজ শুরু হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই গাইড ওয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়ে। এরপর থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলে দাবি তাঁদের। এতে সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে দুর্ভোগ বেড়েছে।
সরকারি চুক্তি-তথ্য অনুযায়ী, কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাংগু মোটরস। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী নিপুর কান্তি দাস, যার ব্যবসায়িক ঠিকানা বান্দরবান সদর উপজেলার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বালাঘাটা হিন্দুপাড়া। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান ইউনিট অফিস।
সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ২১ লাখ ৪০ হাজার ৭৬৭ টাকা ৫ পয়সা। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ৪ জুন ২০২৬ সালে এবং কাজ শেষ করার প্রস্তাবিত তারিখ ৩০ জুন ২০২৭। অর্থাৎ প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় এবং নির্মিত গাইড ওয়ালের অংশ ধসে পড়ার পরও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়ল গাইড ওয়াল;
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগে সড়কটিতে গাইড ওয়াল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই দেয়ালের কিছু অংশ ধসে পড়ে। এতে কাজের গুণগত মান, নির্মাণপদ্ধতি এবং প্রকৌশলগত তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কেন দেয়ালের অংশ ধসে পড়েছে, নির্মাণে নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে কি না এবং নকশা অনুসরণ করে কাজ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিরপেক্ষ প্রকৌশলগত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে চুক্তির শর্ত ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যাহত, বাড়ছে জনদুর্ভোগ;
ইয়াংছা–বদুরঝিরি সড়ক স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে পরিবহন ব্যয় ও ভোগান্তি বাড়ছে। যোগাযোগব্যবস্থার অনিশ্চয়তায় কৃষিকাজ সম্প্রসারণেও বাধার মুখে পড়ছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত ও নির্মাণকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা না হলে সড়কের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি কোথায়?;
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাইড ওয়ালের অংশ ধসে পড়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাংগু মোটরসের লোকজনকে আর নির্মাণস্থলে দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকিও তাঁদের চোখে পড়ছে না। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নিপুর কান্তি দাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পে কাজের মান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকি করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাই নির্মিত দেয়াল ধসে পড়ার কারণ অনুসন্ধান, কাজের বর্তমান অগ্রগতি যাচাই এবং দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি—দ্রুত তদন্ত ও টেকসই নির্মাণ;
এলাকার সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের কাছে দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন, গাইড ওয়ালের ধসে পড়া অংশের কারিগরি পরীক্ষা এবং নির্মাণকাজের মান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের কাজ দ্রুত ও টেকসইভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—২১ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে নির্মিত গাইড ওয়ালের অংশ অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ধসে পড়ল কেন? কাজের মান যাচাই ও তদারকির দায়িত্বে কারা ছিলেন? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে কি?
জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়নকাজে অনিয়ম বা অবহেলার অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। ইয়াংছা–বদুরঝিরি সড়কের কাজ যেন শুধু বরাদ্দ ও চুক্তির নথিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং স্থানীয় মানুষের নিরাপদ যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনে বাস্তব সুফল বয়ে আনে—এটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।