
বর্ষায় বন্যা-ভাঙনে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি, শুষ্ক মৌসুমে সবজি চাষে সমৃদ্ধি; অভিযোগ রয়েছে অবৈধ বালু উত্তোলন ও ডিপোর
চকরিয়া প্রতিনিধি:
ইতিহাস-ঐতিহ্যে ঘেরা মাতামুহুরি নদী। নদীটি একদিকে কক্সবাজারের চকরিয়া অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে নদীতীরবর্তী জনপদের মানুষের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সবজি ক্ষেত। পাশাপাশি নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্র, কৃষি উৎপাদন ও বালুসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মাতামুহুরি নদীর ৪০ কিলোমিটার অংশ চকরিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর দুই তীরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পর্যটন স্পট। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় সবজি চাষ করা হয়। এসব সবজি উৎপাদন ও বিপণনের মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
তবে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নদীর পানি উপচে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও তীব্র স্রোত ও ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং কৃষকের স্বপ্ন নদীগর্ভে বিলীন হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। নদীটির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত শাসন না থাকায় প্রতিবছর একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নদী ঘিরে অবৈধ বালুর ডিপোর অভিযোগ
মাতামুহুরি নদীকে ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, পরিবহন ও মজুত। সরেজমিনে দেখা গেছে, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, চকরিয়া পৌরসভা, কৈয়ারবিল, বরইতলী, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, খোনাখালী ও বদরখালী এলাকায় অন্তত ২০টি বালুর ডিপো রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব ডিপোর বালু উত্তোলন ও ব্যবসার বৈধতা, ইজারা এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের দাবি, নদীর বালুসম্পদকে ঘিরে অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি নদী ও পরিবেশের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক হবে।
স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন ও বাণিজ্যের কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষতির পরিমাণ অর্ধশত কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে তাদের ধারণা। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ভরযোগ্য হিসাব ও আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে রাজস্ব ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পরিকল্পিত নদীশাসনে বদলে যেতে পারে অর্থনীতি
নদী ও পরিবেশসচেতন নাগরিকদের মতে, মাতামুহুরি নদীকে শুধু বন্যা ও ভাঙনের উৎস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক নদীশাসন, প্রয়োজনীয় স্থানে তীর সংরক্ষণ, পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বজায় রাখা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নদীটি স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তাদের মতে, পরিকল্পিত নদীশাসন বাস্তবায়ন করা গেলে বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমবে, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি রক্ষা পাবে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে পানির সুষ্ঠু ব্যবহার, পর্যটন বিকাশ এবং বালুসম্পদের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নদীটির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে জরুরি ভিত্তিতে সমীক্ষা, নদীর নাব্যতা ও প্রবাহপথ নির্ধারণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং অবৈধ বালুর ডিপোগুলোর বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা।
তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিলে মাতামুহুরি নদী আর প্রতিবছরের বন্যা ও ভাঙনের আতঙ্কের নাম হয়ে থাকবে না; বরং কৃষি, পর্যটন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও রাজস্ব আয়ের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।