
লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
মাদক, জুয়া, অনলাইন ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে র্যালী ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) পবিত্র জুম্মা নামাজের পর দুপুর ২টার দিকে ফাইতং স্টেশন চত্বরে ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনসাধারণের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
র্যালীটি ফাইতং স্টেশন চত্বর থেকে শুরু হয়ে স্থানীয় বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় স্টেশন চত্বরে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ফরহাদ আহমদ সজলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বড় মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা আনোয়ার হোসাইন। শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন মোহাম্মদ শাহেদ।
সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। এ ছাড়া বক্তব্য দেন ফাইতং কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সভাপতি মো. আবুল হোসেন, মো. হেলাল উদ্দিন, বেলাল উদ্দিন, রকন উদ্দিন মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ, ফোরকান শিকদার ও ইমাম উদ্দিন।
মাদক–জুয়া প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগের আহ্বান
বক্তারা বলেন, মাদক, জুয়া ও অনলাইন ক্যাসিনো শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এসব কর্মকাণ্ড পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তরুণদের এসব ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ার হোসাইন বলেন, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা ও অনলাইন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইমাম উদ্দিন বলেন, তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও জুয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পরিবার ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদক, জুয়া ও অনলাইন ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশের প্রতিনিধি না থাকায় হতাশা
সমাবেশে বক্তারা জানান, কর্মসূচির বিষয়টি আগে থেকেই ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে অবগত করা হয়েছিল। তবে অনুষ্ঠানে ফাঁড়ির কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এতে বক্তারা হতাশা প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, মাদক, জুয়া ও ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে, তখন স্থানীয় পর্যায়ে এসব সামাজিক সমস্যা নিয়ে আয়োজিত একটি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে পুলিশের প্রতিনিধির উপস্থিতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত। তাঁদের মতে, জনগণ ও পুলিশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধের কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।
একই সঙ্গে কয়েকজন বক্তা ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে থাকা বিভিন্ন আলোচনা ও অভিযোগের বিষয় তুলে ধরে আরও জনবান্ধব ও কার্যকর ভূমিকার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ফাইতং পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘শুধু অভিযান নয়, দরকার সমন্বিত উদ্যোগ’
বক্তারা বলেন, মাদক ও জুয়ার বিস্তার রোধে শুধু অভিযান বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক নজরদারি, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইন প্রয়োগ—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
স্থানীয় জনগণকে মাদক, জুয়া বা অনলাইন ক্যাসিনো সম্পর্কিত তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, অপরাধ প্রতিরোধে জনগণ ও প্রশাসনের পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধারাবাহিক কর্মসূচির প্রত্যয়
সমাবেশ থেকে ফাইতং ইউনিয়নকে মাদক, জুয়া ও অনলাইন ক্যাসিনোর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে ধারাবাহিক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
বক্তারা বলেন, একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একযোগে কাজ করতে হবে। ‘মাদককে না, জুয়াকে না, অনলাইন ক্যাসিনোকে না’—এই সামাজিক বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
র্যালী ও সমাবেশে ফাইতং ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।