সাদ্দাম হোসেন সাইফ | লামা (বান্দরবান): ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ইং, শনিবার
বান্দরবানের লামা উপজেলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দের তালিকা প্রণয়ন নিয়ে অনিয়ম ও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। বিগত বছরগুলোতে বরাদ্দ পাওয়া পাঁচটি পরিচিত বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ দিয়ে তালিকায় নতুন করে আটটি ক্রামা বিহারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক উঃ নন্দমালা থের। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে গত ১৫ অক্টোবর লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী বাদ পড়া বৌদ্ধ বিহারগুলোর নাম পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা, বরাদ্দের তালিকা স্বচ্ছভাবে যাচাই এবং প্রকৃত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বাদ পড়েছে পাঁচটি বৌদ্ধ বিহার;
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরগুলোতে লামা উপজেলায় প্রবারণা পূর্ণিমার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ৭৯টি বৌদ্ধ বিহার সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দ পেত। তবে চলতি বছরের বরাদ্দের তালিকায় পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
১. ইয়াংছা বড় পাড়া বৌদ্ধ বিহার
২. ইয়াংছা হেডম্যান পাড়া বৌদ্ধ বিহার
৩. ইয়াংছা নামা পাড়া বৌদ্ধ বিহার
৪. কৃপাশরণ ও নন্দমালা বৌদ্ধ বিহার
৫. জীনামেজু অনাথ আশ্রম বৌদ্ধ বিহার
অন্যদিকে, নতুন করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আটটি প্রতিষ্ঠান হলো—
১. লুলাইং নয়া পাড়া ক্রামা বিহার
২. নয়া আলক পাড়া ক্রামা বিহার
৩. আলক পাড়া ক্রামা বিহার
৪. ময়ূর পাড়া ক্রামা বিহার
৫. চংকক পাড়া ক্রামা বিহার
৬. ডলা পাড়া ক্রামা বিহার
৭. বোচা পাড়া ক্রামা বিহার
৮. মংয়াং পাড়া ক্রামা বিহার।
‘বৌদ্ধ বিহারের তালিকায় অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম কেন?’
পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক উঃ নন্দমালা থের অভিযোগ করেন, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। তাঁর দাবি, বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসবের জন্য বরাদ্দ করা খাদ্যশস্যের তালিকায় সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধ বিহারগুলোর নাম থাকা উচিত। ক্রামা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি সহায়তা দেওয়া হলে তা পৃথক তালিকা ও স্বতন্ত্র বরাদ্দের আওতায় করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমার মতো বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বরাদ্দের সঙ্গে অন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকা যুক্ত হওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাদ পড়া পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের তালিকায় প্রতিটি বিহারের পরিচালনা কমিটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের নাম, মোবাইল নম্বর ও পূর্ণ ঠিকানা উল্লেখ করার প্রস্তাব দিয়েছেন নন্দমালা থের। তাঁর মতে, তালিকা তৈরির পর উপজেলা ত্রাণ শাখা অথবা সমাজসেবা বিভাগের মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত করে খাদ্যশস্য বিতরণ করা হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে সহায়তার জন্য পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদিত লামা উপজেলার ছাগলখাইয়া বৌদ্ধ বিহারের অস্থায়ী কার্যালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে বলে তিনি জানান।
‘আগেও তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল;
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে প্রবারণা পূর্ণিমা ও সাংগ্রাই উৎসবের সরকারি বরাদ্দের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তাঁর দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা ছাড়া তালিকা তৈরি করে বরাদ্দ আনা ও তা বণ্টন করা হতো। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ এবারও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণের চেষ্টা করছেন বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
যাচাই-বাছাই ছাড়া তালিকা পাঠানো উচিত নয়: সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান;
লামা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা থোয়াইনু অং চৌধুরী বলেন, ধর্মীয় কিংবা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নাম সরকারি বরাদ্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ যাচাই করা উচিত।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর ত্রাণ শাখার মাধ্যমে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।
জীনামেজু অনাথ আশ্রম বৌদ্ধ বিহারের মতো একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টিকে তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, বিতর্কিত তালিকাটি পুনরায় যাচাই করে বাদ পড়া বৌদ্ধ বিহারগুলোর নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হোক।
তালিকা পাঠানোর দায় নিল না ত্রাণ শাখা, পরিষদ বলছে ইউপি সদস্যদের দেওয়া তালিকা;
বরাদ্দের তালিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা জানতে চাইলে লামা উপজেলা ত্রাণ শাখা থেকে জানানো হয়, প্রায় তিন মাস আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সচিবেরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে তালিকা জমা দিয়েছিলেন, সেটিই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
ত্রাণ শাখার বক্তব্য অনুযায়ী, তালিকা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অন্যদিকে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ পড়ার কারণ জানতে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুহুল আমিন খন্দকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, স্থানীয় ইউপি সদস্যদের জমা দেওয়া তালিকা অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য দাবি করেন, এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকা আগে থেকেই ইউনিয়ন পরিষদে জমা রয়েছে। তাহলে তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
এতে তালিকা প্রস্তুত, যাচাই ও অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কার কী দায়িত্ব ছিল, তা স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
ইয়াংছার প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ, স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ;
পাঁচটি বৌদ্ধ বিহারের নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ইয়াংছা এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইয়াংছা এলাকার মানুষ বারবার বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি সহায়তার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে ইয়াংছার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন বাদ পড়বে? ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের অন্য এলাকার মতো ইয়াংছার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও কি সমানভাবে সরকারি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে না?
তাঁরা বলেন, এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা এবং সরকারি বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিষয়টির দ্রুত সমাধান না হলে স্থানীয়দের অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অভিযোগ পেয়েছে প্রশাসন, যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস;
এ বিষয়ে লামা উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত আলীকদমের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে অভিযোগ আকারে এসেছে। বিগত বছরগুলোর বরাদ্দের তালিকা যাচাই করে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হবে। জেলা প্রশাসক যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এখন দেখার বিষয়, যাচাইয়ে কী উঠে আসে;
প্রবারণা পূর্ণিমার সরকারি খাদ্যশস্য বরাদ্দের তালিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বিগত বছরের তালিকা, চলতি বছরের প্রস্তাবিত তালিকা, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের নথি এবং প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব ও কার্যক্রম যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি।
সরকারি বরাদ্দের উদ্দেশ্য যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং কোনো যোগ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেন অযৌক্তিকভাবে সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়—এটাই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা। প্রশাসনিক যাচাই শেষে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।