লামা প্রতিনিধি | হাফিজুর রহমান রাজিব
বান্দরবানের লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও লামা পৌরসভার প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বদলি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় যাচ্ছেন। তাঁর বদলির মধ্য দিয়ে লামায় দায়িত্ব পালনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে। দায়িত্ব পালনকালে লামা পৌরসভার আর্থিক সংকট মোকাবিলা, দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব আদায়ে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।
একসময় আর্থিক সংকট, বিপুল পরিমাণ দেনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের চাপে থাকা লামা পৌরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পৌরসভা-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিনের কিছু দেনা পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধের ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধে উদ্যোগ
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আটকে থাকা সরকারি জিপিএফ (GPF) ও সিপিএফ (CPF) তহবিলের ২৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পৌরসভার বকেয়া বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। বিদ্যুতের অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে ১৮টি অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (BMDF) ঋণ বাবদ ৯ লাখ টাকা এবং জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত বকেয়া ফি বাবদ ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দীর্ঘদিনের এসব দায় পরিশোধের পাশাপাশি পৌরসভার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে পৌরসভার বর্তমান মোট দেনার পরিমাণ এবং সব দায় সম্পূর্ণ পরিশোধ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হালনাগাদ আর্থিক হিসাব প্রয়োজন।
নিয়মিত বেতনে স্বস্তি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের
পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন ছিল বড় সমস্যা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত। বর্তমানে নিয়মিত বেতন পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
পৌরসভার দারোয়ান রাজিব মল্লিক বলেন, আগে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া থাকত। এখন নিয়মিত বেতন পাওয়ায় তাঁদের আর্থিক কষ্ট অনেকটাই কমেছে।
এ ছাড়া পৌরসভার প্রয়াত এক কর্মকর্তার পরিবারের বকেয়া পাওনা বাবদ ৯ লাখ টাকা হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ফাইল অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রয়াত ওই কর্মকর্তার পরিবারের পাওনা নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে।
রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতির দাবি
পৌরসভার আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ৫৮ লাখ ২১ হাজার ৮০৪ টাকা, ট্রেড লাইসেন্স বাবদ ১০ লাখ টাকা এবং নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন সেবা খাত থেকে ৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।
এ ছাড়া দোকানভাড়া বাবদ ৭ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৩৯ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে বলেও পৌরসভা সূত্র জানিয়েছে।
ভূমি উন্নয়ন কর আদায়েও অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এ খাতে ১৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা আদায় হয়। চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আদায় হয়েছে ১৬ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত কর আদায়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং বকেয়া নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে পৌরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও স্থিতিশীল হবে। তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাজস্ব আদায়ের ধারাবাহিকতা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক ও অবকাঠামোগত কাজেও সহায়তা
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বিলছড়ি সিলেটি পাড়া জামে মসজিদের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান পাড়া এলাকার পানির ট্যাংকি মসজিদের চাল মেরামতে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এসব উদ্যোগের পাশাপাশি পৌরসভার নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং নাগরিক সেবার বিভিন্ন বিষয় তদারকি করাও প্রশাসকের দায়িত্বের অংশ ছিল।
পরিবর্তনের পেছনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা
লামা পৌরসভার কর নির্ধারক নুর মোহাম্মদ বলেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অপচয় বন্ধের মাধ্যমে একটি ঋণগ্রস্ত পৌরসভাকে পুনরায় সচল ও স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
নিজের দায়িত্বকালীন কার্যক্রম সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “সরকার আমাকে জনগণের সেবা করার লক্ষ্যেই পাঠিয়েছে এবং আমি অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। লামা পৌরসভার এই দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সহায়তা এবং সচেতন নাগরিকদের নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মাধ্যমে।”
তাঁর বক্তব্যে পৌরসভার আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা এবং নাগরিকদের নিয়মিত কর পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন মঈন উদ্দিন
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. মঈন উদ্দিন। দায়িত্ব পালনকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর প্রশাসক, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসক, সহকারী কমিশনার (ভূমি), রেজিস্ট্রেশন অফিসার ও নির্বাহী আদালতের বিচারক—এমন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এবার বদলি হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলায় যাচ্ছেন তিনি। লামায় তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে নেওয়া আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক উদ্যোগগুলো কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী প্রশাসনের ধারাবাহিক কার্যক্রম, রাজস্ব আদায়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর।
বিদায়বেলায় তাই লামা পৌরসভার আর্থিক সংকট মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগগুলো আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কর্মস্থল আশুগঞ্জে তাঁর পরবর্তী দায়িত্ব পালন নিয়েও আগ্রহ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। লামা পৌরসভায় দায়িত্ব পালনকালে গৃহীত ইতিবাচক উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকলে তার সুফল ভবিষ্যতেও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে পৌঁছাবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।