হাতি সংরক্ষণে বন বিভাগের উদ্যোগ; মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ"
সাদ্দাম হোসেন সাইফ | লামা (বান্দরবান):
বান্দরবানের লামায় বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৬টি পরিবারের মাঝে ২১ লাখ ৫৯ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাতি সংরক্ষণ, বন্যহাতির আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) লামা বন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত হাতি সংরক্ষণ ও বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে চেক বিতরণ বিষয়ক সভায় এসব কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এতে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন অধিদপ্তর ঢাকার প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো, লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন এবং লামা থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ কাইছার হামিদ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন লামা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মাসুদ আলম।
সভায় বন্যহাতি সংরক্ষণ ও হাতির আবাসস্থল রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি হাতির বিচরণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্যহাতির আক্রমণে জানমাল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং মানুষ-হাতির সংঘাত নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, বন্যহাতি দেশের জীববৈচিত্র্য ও বনজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ও আবাসস্থল সংরক্ষণ করা যেমন জরুরি, তেমনি হাতির বিচরণ এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগ, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৬টি পরিবারের মাঝে মোট ২১ লাখ ৫৯ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়। ক্ষতিপূরণের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা হিসেবে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
লামা ও পার্বত্য এলাকার বনাঞ্চলে বন্যহাতির বিচরণ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। বনাঞ্চল ও হাতির আবাসস্থলের সঙ্গে মানুষের বসতি ও কৃষিজমির অবস্থান কাছাকাছি হওয়ায় বিভিন্ন সময় মানুষ ও বন্যহাতির মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে মানুষের বসতবাড়ি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বন্যহাতিরও ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে একদিকে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ রক্ষা, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—দুই বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শুধু ক্ষতিপূরণ প্রদান নয়, মানুষ-হাতির সংঘাতের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগও প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা, হাতির বিচরণ ও চলাচলের বিষয়ে তথ্য দেওয়া এবং বন বিভাগের সঙ্গে স্থানীয়দের সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথিসহ উপস্থিত কর্মকর্তারা হাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন। একই সঙ্গে বন্যহাতির উপস্থিতি বা চলাচলের ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতা অবলম্বন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, সাংবাদিক এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণের মধ্য দিয়ে একদিকে বন্যহাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আর্থিক সহায়তা পেল, অন্যদিকে মানুষ ও বন্যহাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।