সাদ্দাম হোসেন সাইফ | লামা-বান্দরবান;
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬:
পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষির আধুনিকায়ন, কফি ও কাজুবাদাম চাষের সম্প্রসারণ, টেকসই পর্যটন, সুপেয় পানি সরবরাহ এবং পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাচিং প্রু, এমপি ও প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপি।
তারা বলেছেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ই-লার্নিং ও আধুনিক শিক্ষার আওতায় এনে সমতলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকার বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের সভাকক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের আগস্ট মাসের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনা সভায় এসব কথা বলেন তারা।
মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মন্ত্রী সাচিং প্রু, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, এমপি।
সভায় ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাস্তবায়নাধীন এডিপিভুক্ত প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় জানানো হয়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে সরকারি অর্থ (জিওবি) ও প্রকল্প সাহায্যসহ মোট ৯৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
কফি-কাজুবাদামে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা;
সভায় পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিকে আরও উৎপাদনমুখী ও লাভজনক করার ওপর গুরুত্ব দেন মন্ত্রী সাচিং প্রু। তিনি কৃষির আধুনিকায়ন ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরিতে কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পাহাড়ের কৃষিকে আরও সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর মতে, পাহাড়ে একরপ্রতি কফি ও কাজুবাদাম চাষ দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে।
এ ছাড়া পাহাড়ে লাল মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ এবং নেপালের ICIMOD-ভিত্তিক ওয়াটার সোর্স ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও পানির প্রবাহ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সাজেকে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের তাগিদ;
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। মন্ত্রী সাচিং প্রু বলেন, সাজেক ভ্যালিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও যানবাহনের আগমন ঘটছে। এতে পরিবেশ ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে সাজেকে পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিং, ওয়াশরুম সুবিধা ও উন্নত ট্রানজিট পয়েন্ট গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য ও পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
আধুনিক শিক্ষায় সমতলের সমকক্ষ করার লক্ষ্য;
প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন পাহাড়ের শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের ই-লার্নিং ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ দিয়ে সমতলের শিক্ষার্থীদের সমকক্ষ করে তুলতে হবে।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীরা যাতে ভবিষ্যতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষকসহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সে সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিটি উপজেলায় সুপেয় পানি, প্রত্যন্ত এলাকায় সোলার প্যানেল;
পাহাড়ি নারীদের দীর্ঘদিনের পানি সংগ্রহের কষ্ট লাঘবে প্রতিটি উপজেলায় নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন প্রতিমন্ত্রী।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় সোলার প্যানেল স্থাপন এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প গ্রহণের তাগিদ দেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পরিকল্পিত পর্যটন, কর্মসংস্থান ও জীবিকাভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নজরদারি ও সমন্বয়ের গুরুত্ব;
সভায় এডিপিভুক্ত প্রকল্পগুলোর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কংকন চাকমা, যুগ্মসচিব অতুল সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ছালেহ আহাম্মদ, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাম্যা চিং, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রা সা হোয়াই মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে. এস. মং, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী ইলিয়াস মেহেদীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।